আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি যুদ্ধ থামাতে সক্ষম ?

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স  ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ক্রমবর্ধমান আস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও শান্তি স্থাপন নিয়ন্ত্রণ এর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।  আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স হল এক প্রকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যার দ্বারা কোনও কম্পিউটার নিজেই মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে। মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি হল এয়াই এর ই একটি  অংশ যা কোনও কম্পিউটার কে বিভিন্ন বাস্তব ঘটনা ও পরিস্থিতির  উদাহরণ, অতীত কার্যকলাপ, ইত্যাদি  বিশ্লেষণ এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে।

                     কিন্তু এই প্রযুক্তি যুদ্ধ পরিস্থিতি সামলাতে সক্ষম কিভাবে !  এটাও কি সম্ভব ? আজ্ঞে হ্যাঁ যুদ্ধ পরিস্থিতি আগে থেকে অনুধাবন করা থেকে শুরু করে শান্তিস্থাপন এই সব ই আজ সম্ভব হয়ে উঠেছে এয়াই এর দ্বারা । আজ এরকম ই কিছু ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি যাতে বেপার টা আপনাদের কাছে আরও পরিষ্কার হয় ।

                    এয়াই ব্যবহার করে ‘ প্রেডিকটিভ এনালিসিসের ‘,  যা ঐতিহাসিক তথ্য এবং মেশিন লার্নিং এর মাধ্যমে একটা নকশা বা প্যাটার্ন খুঁজে বের করে সেটা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ ফলাফল অনুমান করা হয় । এর দ্বারা এ তৈরি হয়েছে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম বা ইডাব্লুএস । এই সিস্টেম বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা, স্যাটেলাইট ইমেজ, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এগুলি কে বিশ্লেষণ করে আসন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা, দাঙ্গা এমন কি যুদ্ধ কেও আগে থেকে অনুমান করতে পারে।   ‘ ভায়লেন্স আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ‘ (ViEWS) ও ‘ আর্লি ওয়ার্নিং প্রোজেক্ট ‘ (EWP),  এয়াই ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে আগে থেকেই ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো, ইথিওপিয়া এবং মায়ানমার এর মতো দেশ গুলি তে আসন্ন অশান্তির পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরেছিল ।

                    আমরা অনেকেই জানি না যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দিতে এয়াই এর ওপর গবেষণা  উন্নত দেশ গুলো আগে থেকেই শুরু করে দিয়েছিল, এই যেমন আমেরিকার কথাই নাহয়  ধরা যাক ।  ২০০৮ সালে আমেরিকার ডিফেন্স আডভান্স রিসার্চ এজেন্সি – ‘  ইন্টিগ্রেটেড ক্রাইসিস আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ‘  (ICEWS) তৈরি করে। আমেরিকার দ্বারা দাবি করা হয় যে এই প্রযুক্তি ৮০ শতাংশের ও বেশি নির্ভুলতার সাথে সংঘর্ষ ও অর্থনৈতিক সঙ্কট এর মত পরিস্থিতি আগে থেকেই অনুধাবন করতে সক্ষম, ওই দেশ এর আর একটি প্রোজেক্ট – ‘ পলিটিকাল ইন্সটেবিলিটি টাস্ক ফরস ‘  (PITF) এর অ্যালগরিদম, বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা অনুধাবন করতে পেরেছে । 

                     বর্তমান রাশিয়া এউক্রেন যুদ্ধ সকলেই জানেন, আপনারা জানলে অবাক হবেন যে এই যুদ্ধের ও পূর্বাভাস এয়াই দিতে সক্ষম হয়েছিল । আমেরিকার এক কোম্পানির এয়াই মডেল – ‘ রহম্বাস  ‘, যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৪ মাস আগেই অনুমান করতে পেরেছিল যে রাশিয়া এউক্রেন এর ওপর আক্রমণ করবে ।  ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স অর্থাৎ ইন্টেরনেট এ ছড়িয়ে থাকা তথ্য যেগুলো সাধারণ মানুষের আওতায় থাকে সেই তথ্য গুলি কে বিশ্লেষণ করে এই অনুমান করতে সক্ষম ছিল।  তালিবান আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য মার্কিন সেনা রা ব্যবহার করতো – ‘ রাভেন সেন্ট্রি ‘ এর মত এয়াই সিস্টেম এর যা   সোশ্যাল মিডিয়া, নিউজ, স্যাটেলাইট ইমেজ এর সাথে আবহাওয়া পরিস্থিতি কেও বিশ্লেষণ করে তালিবান আক্রমণ এর পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছিল ।

                      কিন্তু শুধু যুদ্ধ পরিস্থিতি অনুধাবন নয়, বরং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তে শান্তিস্থাপন এর কাজেও এয়াই এর উল্লেখযোগ্য ব্যবহার দেখা গিয়েছে । ২০২০ সালে ইউনাইটেড নেশন্স – ‘ রেমেশ ‘ নামের এক এয়াই মডেল এর ব্যবহার করেছিল যার দ্বারা তাঁরা আঞ্চলিক ভাষায় ইয়েমেন ও লিবিয়ার যুদ্ধ দুর্গত মানুষ দের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে পেরেছিল এবং সেই তথ্য তাঁরা শান্তিস্থাপন মিশন এ কাজে লাগিয়ে ছিল , শুধু তাই নয় ইজরায়েল পালেস্তাইন সংঘর্ষের শান্তিরক্ষা কর্মসূচির সদস্য রাও কিছু  যায়গায় এই এক ই এয়াই  মডেল কাজে লাগায় ।  ইউনাইটেড নেশন্স এর উদ্ভাবনী দপ্তরের গবেষক রা এয়াই মডেল এর ব্যবহার করছে বর্তমান শান্তিস্থাপন আলোচনার ফলাফল গবেষণা করতে যাতে পরবর্তী কালে সেই গবেষণা বিভিন্ন দেশ এর  কূটনীতিক কৌশল কে সাহায্য করতে পারে তাঁর সাথে – ‘ মিনুস্কা ‘ এর মতো এয়াই প্রযুক্তি সম্পন্ন ড্রন ব্যবহার হচ্ছে সংঘর্ষ অধ্যুষিত অঞ্চল গুলি পর্যবেক্ষণ করার জন্যে।

                       কিন্তু যেমন সবকিছুর ভালো ও খারাপ দিক দুটোই আছে এয়াই এর ব্যবহার ও অনেক অসামাজিক কাজকর্মে করা হতে পারে। যেকোনো  এয়াই মডেল এর ফলাফল এর সত্যতা নির্ভর করে তাঁর প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা ও নির্ভরতার ওপর, ভুল অথবা একপেশে রাজনৈতিক বা সামাজিক তথ্য এয়াই এর ফলাফল কে প্রভাবিত করতে সক্ষম।  ঠিক সেভাবেই কোনও এক যায়গায় সংঘর্ষ অনুমান করতে বা শান্তিস্থাপন এর জন্য সফল ভাবে প্রয়োগ করা এয়াই মডেল যে সব যায়গায় কাজ করবে সেরমটা ভাবাও ঠিক নয়, কারণ ভিন্ন যায়গার মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও বিশ্বাস ভিন্ন হতে পারে, তাই সেখানে পূর্বে ব্যাবহ্রিত প্রযুক্তি কাজে নাও লাগতে পারে । কোনও যন্ত্র কে সঠিক ভাবে না চালালে যেমন কোনও কাজে লাগে না ঠিক সেরম ই এয়াই ও একটি যন্ত্র যাকে সঠিক সময়ে সঠিক ভাবে কাজে লাগানো দরকার, অর্থাৎ এয়াই আগে থেকেই কঙ্গো, মায়ানমার, রাসিয়া-ইউক্রেন এর পরিস্থিতি অনুধাবন করেছিল কিন্তু বিশ্বরাজনিতি তে শক্তিশালী দেশ গুলির সম্মিলিত রাজনৈতিক সহমত ও প্রয়াস এর অভাবে এই যুদ্ধপরিস্থিতি গুলি আটকানো সম্ভব হয়নি ।   এছাড়াও শান্তিস্থাপন করার অজুহাতে কোনও দেশের সরকার অথবা কোম্পানি  সাধারণ মানুষের বেক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে, সেই সাথে কোনও সরকার তাদের নিজেদের জনগণ এর ওপর ও অনৈতিক নজরদারি চালাতে পারে ।

                        সবশেষে একটা কথা আমাদের মাথায় রাখা দরকার যে আগে যেগুলি আমাদের অসম্ভব বলে মনে হতো,  এয়াই প্রযুক্তি ও মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার সম্মিলিত প্রয়াস সেগুলো কেও সম্ভব করতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় এয়াই এর ওপর নির্ভরশীলটা আবার আমাদের ওপর বিপর্যয় ও আনতে পারে ।  যত বেশি প্রযুক্তিবিদ্যা অগ্রসর হচ্ছে এয়াই ও তত বেশি উন্নত ও কার্যকরী হচ্ছে এবং যেহেতু সংঘর্ষ অনুমান ও শান্তিস্থাপন এ এয়াই এর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখা গেছে তাই এই নিয়ে আর গবেষণার প্রয়োজন আছে। এর জন্যে দরকার সব দেশ গুলির সম্মিলিত অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রয়াস, বিশ্বশান্তির জন্যে নিজেদের  মধ্যে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে বিশ্বে শান্তিস্থাপন হতে পারে।

Leave a Comment