পৃথিবী কি আবার ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে  ?

একটা সময়ে ভারত সহ পৃথিবীর বহু দেশ কিছু মুষ্টিমেয় ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদী দেশ এর উপনিবেশ  ছিল সেটা আমাদের সকলের এ জানা, আজ সময় টা পাল্টেছে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, আদৌ কি আমরা সঠিক ভাবে স্বাধীন হতে পেরেছি ?  বর্তমান আধুনিক সমাজে একটা নতুন ধরনের ঔপনিবেশিক কার্যকলাপ শুরু হয়ে গেছে, যা ভূমি দখল বা প্রাকৃতিক সম্পদ আয়ত্ত করার বদলে মানুষের নিজস্ব অস্তিত্ব ও চিন্তাশক্তি কে দখল করতে চায় ।  এই ডিজিটাল যুগ এ বেড়ে চলা তথ্য প্রযুক্তি মানুষের উন্নতির সাথে সাথে কিছু প্রাইভেট কোম্পানি ও কিছু দেশের সরকারের হাতে আবারো অপরিসীম ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে। যার দ্বারা আবারো উপনিবেশিক চিন্তাধারার বিস্তার ঘটছে। এই ঘটনা টা ডেটা উপনিবেশবাদ হিসেবে খ্যাত ।

                       কিন্তু কিভাবে হয় এই ডেটা বা ডিজিটাল উপনিবেশবাদ ? কিভাবে সাধারণ মানুষ ও প্রগতিশীল দেশ গুলি আবারো নিজেদের  স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্রতা আবারো অন্যের হাতে তুলে ধরছে !  বিশেষজ্ঞ দের মতে প্রধানত ৩ টে ধাপে ডিজিটাল উপনিবেশ ঘটে চলেছে যেখানে প্রথমে আমাদের বেক্তিগত তথ্য আমাদের অনুমতি ছারাই সংগ্রহ করা হয়, তারপর প্রযুক্তিগত কোম্পানি গুলি সেই ডেটা কে কাজে লাগিয়ে অগাধ লাভ অর্জন করে এবং গ্লোবাল সাউথ অর্থাৎ প্রগতিশীল দেশ গুলি বঞ্চিত হয়, এভাবেই প্রগতিশীল দেশ গুলি নিজেদের  ডিজিটাল পরিকাঠামর অভাবে কিছু পশ্চিমা ও চাইনিজ কোম্পানি  গুলির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পরে চলেছে।

                        কিছু উদাহরণের মাধ্যমে বেপার টা পরিষ্কার করা যাক। এই যেমন ধরুন ফেসবুক এর ‘ফ্রি বেসিক সিস্টেম’, ইহা একটি ইন্টারনেট সিস্টেম যার মাধ্যমে ফ্রি ইন্টারনেট প্রদান করে উন্নতিশীল এবং অনুন্নত দেশ গুলি তে ইন্টারনেট এর প্রসার ঘটিয়ে সমাজকল্যাণ এর কাজে ব্যবহার হবে বলে প্রচার করা হয়েছিলো।  কিন্তু এই জনকল্যাণ প্রচারের পিছনে ছিল এক অন্যও মতলব।  বেশ কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে এঁর আড়ালে ফেইসবুক নিজেদের ডিজিটাল ইকসিস্টেম এর আধিপত্য গড়ে তোলে যার দ্বারা ফেসবুক ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রন করে।  ইন্টারনেট ফ্রি হওয়ার কারণে বহু মানুষ এটি ব্যবহার করতে থাকে যার দ্বারা এক বিশাল সংখ্যক মানুষের বেক্তিগত তথ্য ফেসবুক তাঁদের অজান্তেই সংগ্রহ করে তাদের সাথে সম্পর্কিত সার্ভিস বা প্রোডাক্ট প্রচার করতে থাকে। যার  ফলে ফেসবুক বিশাল আর্থিক ভাবে লাভবান হয় কিন্তু দেশীও ছোটো ও মাঝারি ব্যাবসা গুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরে।  এই ঘটনা টি প্রমাণ করে দেয় কিভাবে ডিজিটাল পরিকাঠামর জন্য অনুন্নত ও উন্নতিশীল দেশ গুলি ভীষণ ভাবে কিছু উন্নত দেশ এঁর কোম্পানির ওপর নির্ভর করে থাকে এবং সুযোগ বুঝে তাঁরা সমাজকল্যাণ এঁর নামে নিজেদের আখের টা গোছায়।

                        আজ থেকে বহু বছর আগে ঔপনিবেশিক শক্তি গুলি যখন এশিয়া,আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল এঁর দখল নিতে আসে তখন তাঁরা এখানকার মানুষ ও প্রাকৃতিক সম্পদ গুলি কে বীণা মালিকানাধীন ভেবে নিজেদের বেক্তিগত সম্পত্তি ভেবে নেয়।  সময় বদলেছে কিন্তু তাঁদের সেই চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন এখনো হয় নি।  ফেসবুক, গুগল এবং এটিএন্ডটি এঁর মতো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি গুলি মানুষের সামাজিক ও বেক্তিগত জীবন এঁর তথ্য গুলি কে বীণা মালিকানাধীন সম্পদ ভেবে র’ ডাটার মতো সেগুলি নিষ্কাশন করতে থাকে এবং যার দ্বারা তাঁরা আর্থিক ভাবে লাভবান হয়ে থাকে।

                         আজকের দিন এ কেউ যদি ভেবে থাকেন যে তাঁদের বেক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত আছে তাহলে আরও একবার চিন্তা করুন, কারন গোপনীয়তা ও সম্মতি এইগুলি বোধহয় ইন্টারনেট এঁর যুগ এ অচল।  আপনি কখনো কোনও মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট অথবা কোনও প্রাইভেট কোম্পানির ফর্ম এ রেজিস্টার করতে গিয়ে হয়তো খেয়াল করেছেন যে তাঁদের প্রাইভেসি পলিসি অনেক জটিল ও বড়ো করে লেখা থাকে। বিশেষজ্ঞ দের মতে এটা তাঁরা ইচ্ছে করে করে থাকে, যাতে সাধারণ মানুষের এই প্রাইভাসি পলিসি বুঝতে অসুবিধা হয়।  এঁর একটা উদাহরন হিসেবে কেম্ব্রিজ এনালিটিকা স্ক্যান্ডেল এঁর কথা বলা যায়, যেখানে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষের বেক্তিগত তথ্য চুরি করা হয় ফেসবুক এঁর মাধ্যমে।  এখানে একটি থার্ড পার্টী অ্যাপ – ‘দিস ইস এয়োর ডিজিটাল লাইফ’, ফেসবুক এঁর মাধ্যমে তথ্য নিয়ে টা আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জনগণ কে প্রভাবিত করতে ব্যবহার করে।

                         আপনারা জানলে অবাক হবেন এই বেক্তিগত তথ্য চুরি শুধুমাত্র ডিজিটাল মাধ্যমেই থেমে নেই, বরং মানুষের DNA কেও কিছু সংস্থা নিজেদের সুবিদারথে কাজে লাগাতে পারে। এঁর প্রমাণ পাওয়া গেছে  হাভাসুপাই বনাম অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি কেস এঁর মাধ্যমে। বেপার টা জটিল কিছু  ছিল না, এই হাভাসুপাই ট্রাইব টি আমেরিকার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে প্রায় ৮০০ বছর ধরে বাস করছে। ২০০৪ সালে তাঁরা অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটির সাথে বিবাদে জরিয়ে পরে কারন এই অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটি তাঁদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেছিল যার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল হাভাসুপাই ট্রাইবের ডায়াবেটিস সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসার জন্য গবেষণা করা, কিন্তু পরে তাঁরা জানতে পারে যে তাঁদের রক্তের নমুনা গবেষক রা শুধু এই গবেষণা ছারাও অন্য যায়গায় ও গবেষণার কাজে দিয়েছেন এবং তাও আবার তাঁদের অনুমতি না নিয়েই।  তাঁদের এই নতুন গবেষণার ফলে ৮০০ বছর ধরে চলে আসা হাভাসুপাই ট্রাইব এঁর ঐতিহাসিক বিশ্বাসে আঘাত আসে কারন নতুন গবেষণায় তাদের  DNA পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় যে তাদের  পূর্বপুরুষরা আসলে এশিয়া থেকে এসেছিল, যা কিনা হাভাসুপাই বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত, কারন তাঁরা বিশ্বাস করে যে তাঁরা গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এর ই আদি বাসিন্দা।  যাই হোক তাঁদের DNA  বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্যে ব্যবহার করা হলেও এই ঘটনা আমাদের মনে একটা প্রশ্ন এনে দেয় যে আমরা কতটা সুরক্ষিত !  এই এক ধরনের ঘটনা যে কোনও অবৈজ্ঞানিক কাজে ব্যবহার হবে না তা হয়ত কেউ বলতে পারে না।

                           কিন্তু তাহলে উপায় কি ? এভাবেই কি আবারো আমরা কিছু মুষ্টিমেয় দেশের প্রাইভেট কোম্পানির অধীনে থাকব ! বিশেষজ্ঞ দের মতে সেটা হওয়া আটকানো সম্ভব। কিন্তু তাঁর জন্য গ্লোবাল সাউথ এর দেশ গুলি কে একসাথে আসতে হবে। একে অপরের সাথে সহযোগিতা গড়ে তুলে নিজেদের দেশেই দেশিও ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার গড়ে তুলতে হবে যার দ্বারা তাঁরা মুষ্টিমেয় কিছু দেশের ওপর থেকে নিজেদের নির্ভরতা কমাতে পারে, সেই সাথে বিভিন্ন দেশ গুলিকে তথ্য স্থানীয়করণ  বা ডাটা লোকালাইজেসন এর মতো আইন প্রনয়ন করতে হবে যার দ্বারা নিজের দেশের মানুষের তথ্য নিজের দেশেই সংরক্ষিত থাকে।  এছাড়া দেশের সরকার কে আরও নজর দিতে হবে সাধারন মানুষের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা যেমন- ডাটা সাইন্স, কোডিং, ইত্যাদি শিক্ষা সম্প্রসারণ এর জন্য, কারণ এই সব শিক্ষার দ্বারা মানুষের নিজের বিচার বুদ্ধির ক্ষমতা বেরে যাবে।  প্রতি রিজিওনে দেশ গুলি নিজেরা একসাথে এসে বড়ো কোম্পানি গুলির জন্য কিছু আইন লাঘব করতে পারে, এই ধরনের আইনের দরকার আছে যাতে তাঁরা সেই কোম্পানি গুলির ওপর নিজেদের অঞ্চল থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ট্যাক্স চাপাতে পারবে।