রক্তে রাঙা সোনার দেশ !

আচ্ছা আপনাদের সোনা কেমন লাগে ? হয়তো ভাবছেন এ  কিরম বোকা বোকা প্রশ্ন,  সোনা কার না পছন্দ ! তা সে নিজেকে সাজানোর জন্যে হোক বা ভবিষ্যৎ এর কথা মাথায় রেখে সঞ্চয়ের জন্যেই হোক সোনা সেই প্রাচীন কাল থেকেই সকলের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।  স্বর্ণ প্রাপ্তি সবার জন্যেই মঙ্গলময়,  কিন্তু এই বহুমূল্য সোনালি ধাতুই যদি কিছু স্বার্থান্বেষী হিংস্র মানুষের নির্মম অত্যাচার চালিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়? তখনো কি আমরা সোনা কে মঙ্গলময় বলে ভাবতে পারব ?

                 ১৯৫৫ সালে সুদান ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় কিন্তু তারপর বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং একাধিক গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পরে, শান্তিস্থাপন প্রক্রিয়া বারবার বিঘ্ন হয় এবং নিজেদের মধ্যে এক ভয়ানক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে যার ফলে বলি হয় লাখ লাখ মানুষ এবং এই যুদ্ধ চলার পিছনে সোনা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

সরাসরি ঘটনায় যাওয়ার আগে কিছু ইতিহাস জেনে রাখা দরকার। স্বাধীনতার পরবর্তী কালে সামান্য কিছু সময়ের জন্যে সুদান গন প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে কিন্তু খুব শীঘ্রই সেনা অভ্যুত্থান এর ফলে তা আবার স্বৈরাচারী শাসন বাবস্থায় পরিণত হয়, এভাবেই বার বার গণঅভ্যুত্থান ও পুনরায় সেনাঅভ্যুত্থানের ফলে সেই দেশ এ রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতেই থাকে। এমতাবস্থায়  খ্রিস্টান প্রধান দক্ষিণ সুদান দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে সুদানের থেকে স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে এবং এদিকে সুদানের পশ্চিম অংশ ডারফার এর অ-আরব কালো আফ্রিকান জনগোষ্ঠীরাও নিজেদের প্রতি হয়ে চলা নিয়মিত অবহেলা ও দ্বিচারিতা সহ্য করতে না পেরে তাঁরাও হাতে অস্ত্র তুলে নেয়।  দক্ষিণ ও পশ্চিমে এক ই সময়ে যুদ্ধ পরিচালনা করা তৎকালীন সেনাপ্রধান ও স্বৈরাচারি শাসক ওমার -আল-বাশির এর কাছে যথেষ্ট সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় , আর সেই সমস্যা সমাধানের জন্যে রাষ্ট্রপ্রধান অমার-আল- বাশির ২০০৩ সালে সুদানের পশ্চিমে ডারফার অঞ্চলে নিযুক্ত করেন আরব জনজাতির অন্তর্গত  -“জাঞ্জাউইড”  নামক এক নৃশংস মিলিশিয়া গোষ্ঠীর, এই  “জাঞ্জাউইড”  এর মানে হল “ঘোড়ায় চড়া শয়তান”। ‘ জাঞ্জাউইড ‘  ও সুদানের সেনাবাহিনির  সম্মিলিত হিংস্র নির্যাতনের ফলে ডারফার অঞ্চলে অ-আরব জনগোষ্ঠীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়ায়। ইউনাইটেড নেশন্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষায় উঠে এসেছে ২০০৩ থেকে ২০০৮ এর মধ্যে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষ কে হত্যা ও কয়েক হাজার নারী ধর্ষণ করা হয়েছে সেই সাথে ২ কোটি ৭০ লাখের ও বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। ডারফার জয়ের পর এই ‘ জাঞ্জাউইড ‘  এবং তাঁদের অন্যতম প্রধান নেতা ‘ মুহাম্মাদ  হামদান ডাগালু মুসা ‘  ওরফে ‘ হেমেতি ‘  হয়ে ওঠে আল-বাশিরের প্রিয়পাত্র।  ‘ জাঞ্জাউইড ‘ কে সরকারের আওতায় আনা হয় এবং তাঁদের নামকরণ করা হয় – ‘ র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স ‘ তথা ‘ RSF ‘,  এদিকে নিয়মিত হয়ে চলা যুদ্ধে জর্জরিত হয়ে বাশির এর সরকার দক্ষিণ সুদানের সাথে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয় এবং ২০১১ সালে দক্ষিণ অংশ  আলাদা হয়ে দক্ষিণ সুদান নামে এক পৃথক দেশ সৃষ্টি করে ।  নিয়মিত যুদ্ধ, দুর্নীতি, বেকারত্ব, দারিদ্রতা ও  অব্যবস্থায় জরাজীর্ণ হয়ে সাধারন মানুষ আবারো গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের দাবী তুলে প্রতিবাদে সরব হয়, সেই সুযোগে  ২০১৯ সালে সরকারের বিরুদ্ধে জনবিক্ষভ চলাকালীন RSF ও সুদান আর্মড ফর্স তথা ‘ SAF ‘ সম্মিলিত ভাবে  বাশারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু খুব শীঘ্রই ‘ হেমেতি ‘ ও SAF প্রধান জেনারেল ‘ আব্দুল ফাতা আল-বুরহান ‘ এঁর মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই চালু হয়, যার পরিণাম বর্তমান সুদানের অবস্থা।

আই এম এফ এর এক তথ্য অনুসারে ২০১১ এর আগে খনিজ তেল ছিল সুদানের এক অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস, কিন্তু দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হয়ে যাওয়ার ফলে সুদান বেশির ভাগ তৈল খনি এ হারিয়ে ফেলে , তাই তাঁদের অন্য আয়ের উৎস দেখতে হয়, সুদান আফ্রিকার এক অন্যতম সোনা উৎপাদনকারী দেশ। এছাড়াও তেল, গাম আরাবিক (পানীয় তে ব্যবহার্য এক দ্রব্য) ও পশুজাত দ্রব্য, তৈলবীজ, ইত্যাদি সুদানের অন্যতম আয়ের উৎস।

২০২৩ সালে RSF ও SAF এর মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে দুই দল ই সোনা ও তেল এর খনি গুলি দখলের জন্য লড়াই চালাতে শুরু করে।  অফিসিয়াল ডাটা অনুসারে ২০১৭ এ সুদান ১০৭ টন সোনা উৎপাদন করেছিল, কিন্তু ২০২২ সালে তা কমে হয়ে যায় ৪১.8 টন, বিশেষজ্ঞরা এর কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন বেআইনি চোরাচালান কে, তাঁদের মতে ৫০-৮০% মোট উৎপাদনের সোনা বেআইনি ভাবে রপ্তানি হয়েছে, আসল উৎপাদনের পরিমাণ অফিসিয়াল সংখ্যার থেকে অনেক বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হল এতো পরিমাণ সোনা বেআইনি ভাবে যাচ্ছে কোথায় ? এর থেকে আখেরে কারা লাভবান হচ্ছে ? এবং এই সোনা রপ্তানির সাথে সুদানে ২ বছর ধরে ঘটে চলা এই যুদ্ধরই বা কি সম্পর্ক ? 

সুদানের স্বর্ণ উৎপাদন শিল্পের অধিকাংশই নির্ভর করে সেই দেশ এ অবস্থিত ছোটো ও মাঝারি স্বর্ণ খনি গুলির ওপর। এই খনি গুলি সে দেশের নানান প্রান্তে ছড়িয়ে আছে, উত্তর ও পূর্বের স্বর্ণখনি গুলি আছে SAF er অধীনে এবং পশ্চিমের স্বর্ণখনি গুলি আছে RSF এঁর অধীনে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুসন্ধানে এমন অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেখানে দেখা গেছে  RSF তাঁদের অধিকৃত খনি থেকে বেআইনি পথে সমস্ত উৎপাদিত সোনা UAE তে রপ্তানি করে , তাঁর বদলে UAE,  RSF কে দ্রোণ ও আর্টিলারি দিয়ে সাহায্য করে চলেছে। UAE বর্তমানে তেল থেকে তাঁদের আয় টুরিসম ও স্বর্ণ ব্যবসার দিকে পরিবর্তন ঘটাচ্ছে যার ফলে UAE একটি অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ সংশোধনকারী দেশ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছে। তাই পাচার হয়ে আসা কাঁচা সোনা UAE তে আসার পর সেই সোনার আসল উৎপত্তিস্থল খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব, তারপর সেই কাঁচা সোনা সংশোধন করে তাঁরা নিজেদের বাজারে ছড়িয়ে দেয়। বেশ কিছু রিপোর্টে উঠে এসেছে UAE এঁর বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ স্বর্ণ অলঙ্কারই সুদান থেকে বেআইনি পথে আসা সোনা দিয়ে তৈরি। এই পাচারের ফলে সুদানের সরকারি তহবিল বাঁ সাধারন মানুষ লাভবান হয় না, বরং হেমেতি ও তাঁর পরিবার এবং RSF এঁর অন্যান্য লিডার রা আর্থিক ভাবে লাভবান হন, সাথে SAF এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও অস্ত্র UAE থেকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলি মারফত তাঁদের কাছে আসে।

একদিকে যেমন RSF কে সাহায্য করছে UAE সেরম SAF কে অর্থ ও অস্ত্র মারফত সাহায্য করছে মিশর।  মিশর দেশ টি সুদানের এক পার্শ্ববর্তী দেশ, গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ মিশরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, যার ফলে সেই দেশেও অনেক সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। সেই জন্যে সুদানের শান্তিস্থাপন মিশরের জন্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এছাড়াও মিশর দেশটি নিজেরাও অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভুগছে তাই তাঁদেরও সুদানের সোনার দরকার নিজেদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর গোল্ড রিজার্ভ  বাড়ানোর জন্যে। আর তাঁদের এই কাজে SAF সাহায্য করছে, SAF তাঁদের নিজস্ব অধিকৃত স্বর্ণ খনিগুলি থেকে সোনা পাচার করছে মিশরে।  সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হল মিশর সেই সব পাচার হওয়া সোনা UAE তে রপ্তানি করছে ! মানে বেপার টা এরম দাঁড়ালো যে RSF ও SAF এর অধিকৃত সোনা হয় ঘুরে ফিরে সেই UAE তেই যাচ্ছে। অবশ্য UAE সরকার এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

UAE ছাড়াও রাশিয়ার এক প্রাইভেট মিলিটারি সংস্থা ‘ ওয়াগ্ন্যার গ্রুপ ‘ ও এই সোনা পাচার এর সাথে যুক্ত বলে মনে করা হয়। বেশ কিছু অনুসন্ধানে দেখা গেছে

‘ ওয়াগ্ন্যার গ্রুপ ‘ – ‘ মেরোয়ে গোল্ড ‘ এর মতো কিছু কোম্পানির আড়ালে কয়েকশো টন সোনা রাশিয়া তে পাচার করেছে যার দ্বারা ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে। শুরুর দিকে রাশিয়া RSF এঁর ঘনিষ্ঠ ছিল কিন্তু বর্তমানে রাশিয়াকে কিছুটা নিউট্রাল পর্যায়ে গিয়ে SAF এঁর সাথেও ঘনিষ্ঠ হতে দেখা গেছে।

যে সোনা সুদানের মানুষদের একটা সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ তইরি করতে পারত আজ সেই সোনা ই না থেমে চলা এক যুদ্ধের এবং কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে সুদানের সাধারন মানুষ না খেতে পেয়ে মরছে সেখানে তাঁদের ই মাটি থেকে পাওয়া বহুমূল্য সোনালি ধাতু তাঁদের ই হত্যাকারী ও UAE এর বাজারে কিছু ধনি ব্যেক্তির আরও ধন সম্পত্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করছে, নাহলে দুরে ইউরোপের এক দেশে যুদ্ধের ফান্ডিং এর কাজে ব্যবহার হচ্ছে।  IPC ফুড সিকিউরিটি এঁর তথ্য অনুযায়ী সুদানে ২ কোটি ১০ লাখের ও বেশি মানুষ চরম খাদ্য সঙ্কটে ভুগছে এবং বেশ কিছু যায়গায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছে, অথচ যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য সেই সব জায়গায় আন্তর্জাতিক এইড পৌঁছানো সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞ দের মতে এখনো পর্যন্ত ১.৫ লাখের ও বেশি মানুষ যুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষের কারণে নিহত হয়েছেন ।  UNICEF এর সমীক্ষা অনুযায়ী প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ নারী ও শিশু যৌন নির্যাতনের প্রভাবে আসতে পারে।

এই না থেমে চলা যুদ্ধের কি আদৌ কোনও শেষ আছে ? ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি ও বিভিন্ন দেশ গুলি কে একসাথে এসে যেখানে এই যুদ্ধ থামানোর কাজে সহযোগিতা করতে হতো সেখানে  UAE, RUSSIA ছারাও আরও বেশ কিছু দেশ যেমন সৌদি আরব, চীন, ইরান, জার্মানি, টার্কি, কাতার, চ্যাড, ইত্যাদি দেশের অর্থনৈতিক এবং স্ট্র্যাটেজিক ফায়দা জড়িয়ে আছে, এই যুদ্ধের সাথে। তাই এই যুদ্ধের অবসান কবে হবে ? এর উত্তর তা হয়তো অজানাই থাকবে।